চরিত্র

জয়নাল ভাই, আপনি আবারো লাউড স্পিকারে গান শুনছেন?
-তো কি হইসে? এটাতো ফ্রন্ট অফিস না, ব্যাক অফিস। বস বলসে অল্প সাউন্ড দিয়া শুনতে পারি, সমস্যা নাই। শব্দ করে পানের পিক ফেলতে ফেলতে বললেন আরিশার সহকর্মী জয়নাল ভাই।
-কিন্তু, ভাইয়া, আমারতো মাথা ধরে যায়, আর তাছাড়া আপনার পছন্দের গান তো আমার পছন্দ নাও হইতে পারে।
-অ। এইডা অবশ্য খাসা কতা কইস। খাড়াও, হেড ফুন লাগাইতেসি।তোমার হেড ফুন টা দাওতো।
-আপনারটা লাগান না! বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করতে করতে বলল আরিশা।
-ক্যান আরিছা, তোমারডা আনো নাই?
-এনেছি, কিন্তু হেডফোন শেয়ার করা ঠিক না, আর আমার নামতো আরিশা! এমন বিচ্ছিরি করে আরিছা বলবেন নাতো জয়নাল ভাই!
-আইচ্ছা। আরিসা! এইবার হইছে? আর হুন, আমার কানে ময়লা নাই, কাইলকাই জালি দিয়া পরিস্কার করসি, দেহ! দেহ!
-না! না! দেখানো লাগবেনা। আর আমি ময়লার কথা বলছিনা! আচছা নেন, এই হেড ফোন টা আপনি রেখে দেন, আর দেয়া লাগবেনা। আর হ্যা। ইটস আরিশা, আরিসা না। “তালব্য শ”, “দন্ত্য স” না। মনে থাকবে?
-হ, হ! মনে থাকব, তালিবাস্য। আইচ্ছা! কাম কর, কাম কর। তোমার বসে আবার কইসে আইজকা মিটিং আসে! বাজেট নিয়া বসবে।
বস মানে নিয়াজ ভাই। বেশ মার্জিত লোক। যেমন জ্ঞানী, তেমন স্মার্ট। অফিসের জুনিয়র সিনিয়র সবাইকে খুব সম্মান করে কথা বলেন। আর অবাক ব্যাপার হচ্ছে তিনি ছোটখাটো বিষয়ে ও অনেক কেয়ারিং, বিশেষ করে মেয়েলী ব্যাপারগুলোতে। কোন এম্পলয়ির বিশেষ ট্রান্সপোর্ট ফ্যাসিলিটি দরকার, কার ক্যাটারিং চার্জ কম হওয়া উচিৎ, মেয়েদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা, সব খেয়াল রাখেন উনি। এমনকি মেয়েদের বিশেষ দিন গুলোর কথা মাথায় রেখে তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে মেয়েদের ওয়াশ রুমের সাথে ন্যাপকিন বুথ করেছেন। এককথায় বেশ চমৎকার লোক।
“সোনাবন্ধু, তুই আমারে ভোতা দা দিয়া কাইট্টালা, যাইত্তা ধইরা মাইরালা…..”জয়নাল ভাইয়ের পিসি থেকে উড়ে আসা বিচ্ছিরি গানের কথায় আরিশার ভাবনায় ছেদ পড়ল।
-স্যরি, স্যরি, হেডফুন খুইল্লা গ্যাছিল গা।লজ্জিত ভঙগীতে বললেন জয়নাল ভাই।
এই লোকটা ও না! কোথায় বস, নিয়াজ ভাই!আর কই জয়নাল ভাই! কি গানের রুচি উনার।
এত মেধাবী লোকটা! এত ভালো ভালো আইডিয়া দেয়, কিন্তু ভদ্রতার বালাই নেই। অফিসে বসেই খ্যাস খ্যাস করে পান খায়। আবার ডেস্কে রাখা একটা কন্টেইনারেই সশব্দে পানের পিক ফেলে। কি যে ঘেন্না লাগে! ভাবছিল আরিশা।
এই তো সেদিন, বাসায় ফেরার পথে হঠাৎই প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হল।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোন সি এন জি পাচ্ছিলনা সে। একটা সি এন জি আসতেই জয়নাল ভাই উঠে তাকে কিছু না বলেই রওনা করছিলেন, ভদ্রতা বশত একটু জিজ্ঞেস ও করলেননা, আরিশা তার সাথে যাবে কিনা। উপায় না দেখে আরিশা দৌড়ে সি এন জি থামিয়ে জয়নাল ভাইকে অনুরোধ করল তাকে একটু নামিয়ে দিতে।
-ঠিক আসে, ভাড়া কিন্তু অর্ধেকই দেয়া লাগবে, কম দিলে হইবনা।
জয়নাল ভাইয়ের উত্তর শুনে অবাক হয়নি সে, এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে তার ব্যবহারে। তবে চট করে বিরক্তি আর অশ্রদ্ধা চলে আসে।
-জয়নাল ভাই, আপনার ছাতা টা একটু দিবেন? আমার তো গলি থেকে অনেক খানি পথ হেঁটে যেতে হবে, ভিজে যাব। আপনিতো বাসার সামনেই নামবেন।
-এ্যাহ!আইসে! খাইতে দিলে শুইতে চায়। না না! ছাতা দেওন যাইবোনা। পরে কাল কে আইয়া কইবা,” ইয়ে, জয়নাল ভাই একদম ভুলে গিয়েছি, জানেন? স্যরি! স্যরি।”
ভিজ গা যাও! বর্ষা কালে ব্যাগে ছাতা রাহোনা ক্যান?
একথার পর আর কিছু বলার থাকেনা। হনহন করে ভিজতে ভিজতেই বাসার পথ নিয়েছিল আরিশা।
জয়নাল ভাইয়ের কীর্তি কলাপ ভাবতে ভাবতেই বিরক্তি ফুটে উঠছিল আরিশার চেহারায়।
নিয়াজ ভাই মিটিং শুরু করলেন সন্ধ্যা ছ’টায়, অফিস আওয়ারের পর। সবার বাজেট নিয়ে আলাদা করে বসছিলেন। আর স্বাভাবিকভাবেই যার যার মিটিং শেষ করে সবাই অফিস লিভ করছিল। আরিশার টার্ন আসল সবার শেষে। রাত তখন নয়টা। আর কোন স্টাফ তখন নেই অফিসে, সে আর নিয়াজ ভাই ছাড়া।
-ওহহো। আপনার কথা তো মাথায়ই ছিলনা। আপনাকে তো আগেই ছেড়ে দেয়া উচিৎ ছিল। এত রাত হয়ে গেল, আপনি এখনো অফিসে! আম সো স্যরি। এক কাজ করেন, আপনি বরং আজ চলে যান, কাল বসি আপনার সাথে। কি বলেন?
-না! না! ঠিক আছে ভাইয়া! ১০ মিনিটেরই তো ব্যাপার, এতক্ষণ বসলাম, আজই শেষ করে ফেলি। নো প্রবলেম৷
-আর ইয়ু শোওর?
-জ্বী ভাইয়া।
মিটিং শেষ করে নিয়াজ ভাই বললেন, আরিশা আপনি ওয়েট করেন,আপনাকে ড্রপ করে দিব। এত রাতে একা যাওয়া ঠিক হবেনা।
-না,না ভাইয়া, আমি যেতে পারব, ইটস ওকে। তাছাড়া আপনার বাসা তো অন্য পথে!
-কোন সমস্যা নাই, আজ না হয় ডিনারটা আপনার বাসাতেই করলাম!হা! হা! হা!
১৩ তলার অফিসঘর থেকে নিচে নামতে লিফটেই চড়তে হল আরিশাদের। মাঝপথে হঠাৎ লিফট আটকে গেল। ইমারজেন্সি বাটন প্রেস করেও কোন লাভ হলনা।আধ ঘন্টার মত কেটে গেল বন্ধ লিফটে। আরিশা বেশ টেনশানে পরে গেল। টেনশান বললে কম বলা হবে, রীতিমতো আতঙকিত বোধ করতে লাগল সে।
এর মধ্যেই আকস্মিক আরিশাকে জড়িয়ে ধরলেন নিয়াজ ভাই। চিৎকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে আরিশার মুখ চেপে ধরেন নিয়াজ ভাই। এমন ধ্বস্তাধস্তির মধ্যেই হঠাৎ লিফটের দরজা খুলে যায়।
ভ্যাবাচেকা খেয়ে ছিটকে দূরে সরে যান নিয়াজ ভাই।জয়নাল ভাইকে দেখে বিরক্তমুখে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি? তুমি এখানে কি করছ? যাওনি এখন ও!
-আহ! মাইয়া মাইনসেরে নিয়া পারা যায়না! এমুন ফ্যাচফ্যাচ কইরা কানতেস ক্যান? এমন ঘটনা এই প্রথম না। বছরে, দুই বছরে একবার কইরা হয়।নিয়াজ ভাই দ্বায়সারা দু’একটা কথা বলে পালিয়ে বাঁচার পর আরিশা যখন হাউমাউ করে কাঁদছিল তখন বললেন জয়নাল ভাই।
আরিশার জিজ্ঞাসু চাহনি দেখে আরো বললেন,
-হ, প্রতিবার এই ঘটনার পর বসের নতুন বিয়া হয়।
লিফট থাইকা নাইমা যাওয়ার পর মাইয়াডারে ফুসলাইয়া, নয়ত হুমকি দিয়া বিয়া করে তোমার নিয়াজ ভাই। তারপর, বড়লোকের বউ! চাকরি ও ছাড়াইয়া নেয়।
দুই এক মাস সংসার করার পর ওই মাইয়ারে আর দেখা যায়না। দুনিয়ার কোথাও আছে কিনা জানিনা, তয় শহরের কোথাও খুইজা পাবা না তাদের, বাত্তি জালাইয়া খুজলেও।
-জয়নাল ভাই, আজ সেরকমই একটা দিন, আর এমন একটা ঘটনা ঘটবে আপনি আগে থেকেই জানতেন, তাইনা?
আর আপনার মিটিং তো শেষ হয়েছে সেই ৬.৩০ এ। আপনি এখনো বাড়ি যান নি কেন?
-উফফ! এই জন্যই মাইয়া মানুষ দ্যাখতে পারিনা আমি৷ খালি ফ্যাচর! ফ্যাচর! এত কতা কও ক্যান! হ্যা?
বাড়ি যাও। বাড়ি গিয়া রিজাইন লেটার রেডি কর। আর বিদেশ যাইবা নাকি একটি দেশেই গুম হইবা হেইডা ও পরিবারের সাথে কতা কইয়া ঠিক কইরা নাও। কাল থেইকাই তোমার পিসনে গুপ্তচর লাগবো।
আমিও যাই, আমারেওতো রিজাইন লেটার রেডি করতে হইব।
আরিশার মাথা কাজ করছেনা। শুধু ভাবছে, ছোট বেলা থেকে জেনে এসেছে,
“Attitude shapes one’s behavior and human character is reflected through people’s behaviour.”
জয়নাল ভাই আর নিয়াজ ভাই কি এই থিয়রির ব্যাতিক্রম? ইনাদের কারো ব্যবহার দ্বারাই তো তাদের চরিত্র বোঝা গেলনা…..
#চরিত্র
#সৈয়দা_আঞ্জুমান_আরা_শারমিন
