প্যারেন্টিং

প্যারেন্টিং

প্যারেন্টিং, ইদানিং কালের কঠিন চ্যালেঞ্জ গুলোর মধ্যে অন্যতম। আমদের পরের জেনারেশন, অর্থাৎ, ৯০ দশকের পরে জন্ম নেয়া বাচ্চাগুলোকে ও দেখতাম সব এক ই রকম, খেতে চায়না। সব মায়ের এক ই কম্পলেইন, কিছুই খায়না বাচ্চা। তখন ঘরে ঘরে ইউটিউব ছিলনা, বোনের বাচ্চাদের দেখতাম,বিজ্ঞাপন দেখে খেত। স্বপরিবারে আমরা তাই প্রার্থনা করতাম, আল্লাহ্,খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন চলতে থাকে এড।
এরপর শুরু হলো স্পিচ ডিলে, হাইপার এক্টিভ সিম্পটম সহ আরো অনেক চাইল্ড ডিসিস। বলা হল, নাহ্, বাচ্চাদের আর পুতুপুতু করা যাবেনা, টিভি দেখতে দেয়া যাবেনা, সব গেজেট কেড়ে নিতে হবে। তার বদলে বাচ্চাদের খেলতে দিন, মাঠে ঘাটে ছেড়ে দিন। অথচ হায়! কত মার খেয়েছি, মাঠে ঘাটে খেলে পড়া নষ্ট করেছি বলে, কত বেত ভেঙেছে পিঠের উপর, ইউনিফর্ম নোংরা করেছি বলে।আজকাল ডাক্তার রা কি বলে? বাচ্চা কে আঘাত করবেন না, মনের উপর বিরুপ প্রতিক্রিয়া হবে বাচ্চার মনে। উইথ ডিয়ু রেসপেক্ট, তাহলে তো আমাদের জেনারেশন এর সবাই এতদিনে পাগলা গারদে পদ্য লিখত, এতো মার খেয়েছি জীবনে।
জোকস্ আপার্ট, খুব সিরিয়াস ব্যাপার ঘটে গিয়েছে পাশের বাসায়। বাস্তবিকই সিরিয়াস। অফিস থেকে আশার পর পরই বাসার কাজের মেয়েটা বলল,
-আফা, সিনথিয়াদের বাসায় সিরিয়াস কেচাল হইসে, খালাম্মা আপনারে যাইতে বলসে।
সিনথিয়ার মা, আমার বয়সে খুব বেশি হবেনা, অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় উনার মেয়ে বড় হয়ে গিয়েছে, আর আমার ছেলে মাটির সাথে কথা বলে। এ কারণেই বুয়া সম্প্রাদায় আমাকে আপা বললেও সিনথিয়ার মাকে খালাম্মা বলে। তড়িঘড়ে করে ফ্রেশ হয়ে গেলাম, কি এমন হয়েছে শুনতে।
কাহিনী শুনে আমি বেকুব বনে গেলাম। সিনথিয়াকে এই সেদিন ও ডায়াপার পরা দেখেছিনা? মনে মনে ভাবলাম আমি। আরেকবার পড়লাম চিঠিটা।
-এটা সিনথিয়ার লিখা? শিউর আপনি?
-সিনথিয়ার মায়ের কান্না থামছিলইনা, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো শুধু।
অপরিণত হাতের প্রেম পত্রটা আরেকবার পড়লাম আমি, “কাল রাতের কথা আমি কখনো ভুলবনা, আমার জীবনের স্মরণীয় রাত, এরপর মৃত্যুকে আলিংগন করতে ও ভয় নেই আমার।” অসংখ্য বানান ভুলে ভরা চিঠিটা আর পড়ার রুচি হলনা।
-ছেলেটা কে?জিজ্ঞেস করলাম সিনথিয়া কে।
মাথা নিচু করে বসেই রইল মেয়েটা, কোন কথা বললনা।
বেশ মায়া লাগছিল মেয়েটার জন্য। সবে ১২ শেষ করে ১৩ তে পা দিয়েছে।
-তুমি ভয় পেওনা মা, নির্ভয়ে বল, অভয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে চেন ছেলেটাকে?
-ফেইসবুকে পরিচয়।
-ও আল্লাহ্, তোমার ফেইসবুক আইডি ও আছে?কিন্তু
আমি তো জানি ১৮ না হলে ফেইসবুক একাউন্ট খোলা যায়না!
-আন্টি, বার্থ ইয়ার বাড়িয়ে খুলেছিলাম।
নীল পরী নিলাঞ্জনা! এই নামে একাউন্ট খুলেছে মেয়েটা, ওয়াল জুড়ে সব নায়িকাদের ছবি দেয়া, তার প্রোফাইল এ ও অন্য কোন মেয়ের ছবি দেয়া, কোন উঠতি মডেল এর সম্ভবত।
-কাল রাতে কি হয়েছিল? জিজ্ঞেস করলাম আমি?
-আন্টি বিশ্বাস করেন, খারাপ কিছু করিনি আমরা! শুধু ছাদে বসে চাঁদ দেখেছি।
-খারাপ কিছু মানে? আর ছেলে সারারাত তোমাদের বাসার ছাদে ছিল, তোমার সাথে?
উওর দিলনা সিনথিয়া।মাথা নিচু করে বসে রইল।আমি ও আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলামনা। কি শুনতে আবার কি শুনে ফেলি তার ঠিক নেই।
মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি তার মায়ের সাথে বসলাম।
-কতদিন ধরে চলছে এসব?
-হাউমাউ করে কেঁদে দিল সিনথিয়ার মা, বিশ্বাস করেন আপা, আমার মেয়ে এমন ছিলনা, খুব ই লক্ষ্মি ছিল। সারাদিন দেখতাম পড়াশোনা করে, আড্ডাবাজি করেনা, ক্লাসে ছেলেদের সাথে মিশেনা! কি থেকে যে কি হয়ে গেল?
-সারাদিন পড়াশোনা করে মানে? ও খেলাধুলা করেনা? কার্টুন দেখা, কমিকস পড়া, ড্রয়িং করা এগুলোর অভ্যাস নেই? কোন এক্সট্রা কারিকুলার এ দেন নাই?
-কি বলেন আপা? পড়াশোনা করেই কুল পায়না! এগুলো কখন করবে?আর ওর বাবা একটু রক্ষনশীল, গান বাজনা পছন্দ করেনা।
-হুম, সিরিয়াল দেখে?
-শুধু দুইটা, ত্রিনয়ণী আর সৌদামিনীর সংসার। বেশ অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলেন মহিলা।
-হুম, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, দোষ সিনথিয়ার  না, দোষ আসলে আমাদের। এ বয়সে আমরা কি করেছি? মনে করে দেখেন তো, মাঠে ঘাটে দাবড়ে বেরিয়েছি, কমিকস পরেছি, কার্টুন দেখেছি, স্পেল বাইন্ডার দেখেছি, প্রেম কি জিনিস বুঝতেন এ বয়সে? আর ছেলেদের সাথে মিশেনা মানে? এ বয়সে ছেলে মেয়ে পার্থক্য আসল কেন ? ক্লাসের সবাইকেই তো বন্ধু ভাবার কথা।
একটা বাচ্চাকে জোড় করে নারী বানিয়ে দিচ্ছি আমরা। কেড়ে নিচ্ছি তার শৈশব। ওর এখন কার্টুন দেখার বয়স, বড়জোর ক্রাফটমেকিং প্রোগামস! সিরিয়াল না। তাছাড়া মেয়েকে এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস এ ইনভলভ করুন, ধর্মিও অনুশাসন থাকলে ড্রয়িং শেখান, ডিবেইট করতে দিন। এগুলোতে বাচ্চাদের সময় নষ্ট হয়না বরং স্কিল ডেভেলাপড হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে, আর দেখবেন, স্কুলে ও রেজাল্ট ভালো করছে। আর আপনিও মেয়েকে সময় দিন, তাকে বুঝুন, তার চাহিদা গুলো জানতে চান, আর ছেলেমানুষী মনে হলে ও মাঝে মাঝে তার সাথে পাগলামি করুন-বৃষ্টিতে ভিজুন, সারারাত জেগে চাঁদ দেখুন।
মোটকথা, বন্ধু হয়ে যান বাচ্চার, আর স্পেস দিন নির্ভয়ে মনের কথা বলার। তাহলেই আর বিশেষ বন্ধু খুঁজতে যাবেনা, বিনোদনের অভাব ও হবেনা আর
উল্টাপাল্টা কিছু করার টাইম ও পাবেনা।
আর এখন তো যা হওয়ার হয়েই গিয়েছে, মেয়েকে অভয় দিন, তার কথা শুনুন, আর মারধোর, বকাবকি না করে কাউন্সেলিং  করুন।
বলছিলাম প্যারেন্টিং এর কথা। এখন তো মনে হচ্ছে আমাদের মায়েরাই অনেক আধুনিক ছিলেন, কোন রকম ট্রেইনিং ছাড়াই সাকসেসফুলি মানুষ করেছেন ৭-৮ টা বাচ্চা। আর আমরা এখন একটা সামলাতেই হিমশিম খাই। এখনকার বাচ্চা গুলো কি তবে রাতারাতি অনেক স্মার্ট/বদ হয়ে গিয়েছে? রিসার্চ কিন্তু তা বলেনা। বাচ্চা হচ্ছে কাঁদামাটির মত নরম, যা শেখাবেন তাই শিখবে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, আমার ছেলে কে আমি যেমন গুড বয় বলে বাহবা দেই, সে ও তেমন তার কাজিন সিস্টার কে বলে গুড বয়! নানা নানি, বাবা, মা সবাইকেই সে সেইম কথা বলে। গুড বয়। আমি, আমরাই তাকে বয়, গার্ল, ম্যান, উইমেন এর পার্থক্য করে শিখাচ্ছি। তাই সময় এখন সতর্ক হওয়ার, বাচ্চাকে বোঝার এবং তাদের সঠিক মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা।
পুনশ্চঃ বাচ্চা খায়না এ কথাটা মানতে কষ্ট হয় আমার, আমার অভিজ্ঞতা বলে বাচ্চা খায়না দুটো কারণে, এক. তার খিদে নেই দুই. খাবারটি তার পছন্দ হয়নি। একবার ভেবে দেখুন তো, আপনাকে ভরা পেটে এক গামলা ভাত খেতে দিলে কেমন লাগবে আপনার? কিংবা লবন ছাড়া বিস্বাদ কারি? তাই অনুরোধ, বাচ্চাদের প্রতি সদয় হোন।
হ্যাপি প্যারেন্টিং।

About the author

Add Comment

By Robin