জীবন সুন্দর

জীবন সুন্দর

– কোথায় গেলে? শুনছ? পরীর মা, তাড়াতাড়ি এসো, দেখে যাও, কি কান্ড!
-কি হল, এত চেচাচ্ছ কেন? নিশ্চয়ই আবার বাজার থেকে গাঁদা খানেক মাছ নিয়ে এসেছ?
– আরে না, দেখ দেখ আজ বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে, আর খুশির সংবাদ হচ্ছে আমাদের পরী চান্স পেয়েছে!
-কি বল! পরীতো বলেছিল পাশ ই করবেনা, চান্স পেল কি করে? রোল নাম্বার ঠিকঠাক দেখেছোতো?
-আরে! ঠিকঠাক দেখবনা মানে? ৯০৯৬৪৮, আমার তো মুখস্থ। আচ্ছা, যাও, বিশ্বাস না হলে এডমিট কার্ডটা নিয়ে এসো। তোমার আলমিরাহতেই তো আছে।
-আচ্ছা, নিয়ে আসি…
-হুম, রোল নাম্বার তো ঠিকই আছে দেখছি।
-চল খবরটা দেই মেয়েটাকে, না, না, আজ আর ফোন না, চল গিয়ে দেখে আসি, কতদিন দেখিনা মেয়েটাকে!
গেইটের কাছে  এসে আর নিজেদের ধরে রাখতে পারলেন না পরীর বাবা মা। ডুকরে কেঁদে উঠলেন মেয়ের সমাধিস্থলে এসে।
-কেন মা, কেন এত অভিমান করে চলে গেলি আমাদের একা করে? কি সুখে আছিস এখন একা ওই অন্ধকার ঘরে! বুয়েটে যারা পড়েনা তারা কি মানুষ না? আমরাতো শুধু তোকেই চেয়েছিলাম! তোর অর্জনে খুশি হতাম, কিন্তু না হলে তো তিরস্কার করতাম নারে। জীবনের চেয়ে কি সাফল্যের দাম বেশি? সেই তো সফলতা আসল, কিন্তু তুই রইলিনা! আর্তনাদ করে বলে উঠলেন পরীর মা।
-রেজাল্ট দেয়া পর্যন্তও অপেক্ষা করলিনা! এবার বলে উঠলেন পরীর বাবা। পরীক্ষা খারাপ হলো বলেই চলে গেলি ওপারে। কি হত চান্স না পেলে, অন্য আরো অনেক সুযোগ ছিল, সেগুলোতেও না হলেও তো ক্ষতি ছিলনা, ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া ও তো আরো অনেক প্রফেশান আছে। কি সুন্দর ডিজাইন করতি তুই, তুই না হয় ইন্টরিয়র ডিজাইনার কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনার ও তো হতে পারতি! কিংবা যা হোক একটা কিছু হতি। সফলতা তো আসতোই! না আসলেও আমরা একসাথে তো থাকতাম! বেঁচে থাকতাম! এখন দেখ, আমাদের কেমন জীবন্মৃত করে চলে গেলি তুই।
কাঁদছেন পরীর বাবা মা, আর ওদিকে কাঁদছে পরী।আর  চিৎকার করে বলছে, মা, মাগো, আমি ভালো নেই মা! একটু ও ভালো নেই। অন্ধকার একা ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসে বলে নয়, আমার খুব তোমাদের কথা মনে পড়ে। সন্ধ্যায় একসাথে টিভি দেখা, রাতে খাবার টেবিলে বাবা মেয়ে মিলে মাকে একসাথে জ্বালানো, এগুলো খুব মিস করি। আর তোমরা যখন আমার নাম্বারে ফোন দিয়ে আমার কন্ঠটি শুনতে না পেয়ে অঝোরে কাঁদো, আমার খুব  কষ্ট হয় মা!  আমি ভুল করেছি মা, আমার ইঞ্জিনিয়ার  না হলেও চলবে মা।কতকিছু করা বাকি রয়ে গেল, সাজেক যাওয়ার কথা ছিলনা আমাদের পরীক্ষার পর, আমার সলো এক্সিবিশন হওয়ার কথা ছিল দৃক গ্যালারি তে, আর বন্ধুদের সাথে তো ট্র‍্যাকিং এও যাওয়া হলোনা বান্দারবনে। আমি ভুল করেছি বাবা, আমি আবার তোমাদের সাথে থাকতে চাই, আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে, প্লিজ…..
ইট পাথরের এপিটাফ ভেদ করে পরীর কান্না আর পৌঁছালোনা তার বাবা মায়ের কান পর্যন্ত।
-এতো গেল পরীর গল্প, এবার আমার গল্প বলি শোন,মিসেস রেহানা বলছিলেন সদ্য ইন্টার পাশ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া তাঁর শিক্ষার্থীদের।
আমি রেহানা পারভীন। কোন এক মফস্বলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। আটভাইবোনের সংসারে বাবা মায়ের ৭ম সন্তান হলেও আমার প্রতি পরিবারের কারো যত্নের কোন কমতি ছিলনা। বিশেষ করে বড় ভাই বোনদের অনেক আদরের ছিলাম।
পারিবারিকভাবে বেশ ভালো পরিবেশে বেড়ে উঠলেও শৈশবেই দেখে ফেলেছিলাম জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর কালো অধ্যায়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ৭বছর বয়সে  ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা আমি বুঝতেই পারিনি ১৫ তে  পরার আগে। তবে বুঝতে পারাটা মোটেও সুখের ছিলনা আমার জন্য, কারণ বয়স্বন্ধির সেই সময়টাতে এক আকস্মিক ঘটনায় আমি বুঝতে পারি ললিপপ, টফি খাওয়ার বয়সটাতেই আমি পৃথিবীর ভয়াবহ রুপ দেখে ফেলেছি। কিন্তু কৈশোরের সেই সময়ে এসে  ঘটনার ভয়াবহতা সামাল দেয়ার সক্ষমতা আমার ছিলনা। ফলশ্রুতিতে, প্রাথমিক অবসেশন থেকে ধীরে ধীরে একুইট সাইকোলজিকাল ডিসঅর্ডার দেখা দেয় আমার।
এরপরের দুইটি বছর আমার কেটেছে বিভিন্ন থেরাপি আর ঘুমের ঔষধের সাথে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন আমার এস এস সি আর এইচ এস সির মত গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পরীক্ষা সামনে, সেই সময়টাতে দিনের পর দিন আমি ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি। আর যে মানুষটি না ঘুমিয়ে রাতের পর রাত কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি আমার মা। এই মায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কারনেই হয়ত সৃষ্টিকর্তার করুণা হয় আর তলিয়ে যেতে দিলেন না আমার মায়ের স্বপ্নকে।
হ্যা, মা স্বপ্ন দেখতেন পড়ালেখা করে অনেক বড় হব, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করব কোন এক উচ্চতায়। তাঁর জন্যই হয়ত সময় মত এস এস সি আর এইচ এস সির গন্ডি পেড়িয়ে গেলাম। মানসিক ভাবে বিদধস্ত এই সময়ে আমার এভারেজ রেজাল্টে পরিবার সন্তুষ্ট থাকলেও নড়ে চড়ে বসলাম আমি। হায়! এ কি করে বসলাম আমি। বানিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করেছিলাম বড় ব্যাংকার হয়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করব বলে। তাই স্বপ্ন দেখতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এমবিএ করব। কিন্তু এস এস সি তে উতরে গেলেও এইচ এস সি তে এতই সাধারণ রেজাল্ট করেছিলাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছিলাম, এস এস সি, এইচ এস সি এর পয়েন্টের কারণে।
জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বছর এভাবে হারালাম বলেই  কিনা জানিনা, কি এক আশ্চর্য মনোবল ফেরত পেলাম ইন্টারের রেজাল্টের পর ,আদা জল খেয়ে লেগে পড়লাম। ফলাফল, সুযোগ পেয়ে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে,সৃষ্টিকর্তার কৃপায়। সেই থেকে শুরু, পণ করেছি, হেরে যাবনা। যে ঘটনার উপর আমার কোন হাত নেই, সেই ঘটনা ভেবে পিছিয়ে যাবনা। সৃষ্টিকর্তা একবার সুযোগ দিয়েছেন, বারবার দিবেন, এমনটা আশা করা বোকামি।
জীবনে খুব বড় কিছু হয়েছি, তা না, তবে ছোট্ট  শহরের এক সহজ সরল মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছি, এটাই বড় পূর্ণতা। তাঁর জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে ব্যাংকে জয়েন করেছিলাম।
জীবন যদি সিনেমা হত, কিংবা এক ঘন্টার নাটক নয়ত কোন প্রামাণ্যচিত্র, এখানেই হয়ত দি এন্ড হত, দি হ্যাপি এন্ডিং। কিন্তু না, আরো ঝড় এসেছে জীবনে। কখনো ব্যথিত হয়েছি, কখনো সামলে নিয়েছি, কিন্তু ভেঙে পড়িনি। বয়স, অভিজ্ঞতা আর পরিস্থিতির চাপে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে শিখেছি। ভীষণ অবসাদের দিন গুলোতে নিজের প্যাশান নিয়ে ব্যস্ত থাকি। লেখালেখি করতে ভালোবাসি আর ভালোবাসি মোটিভেশনাল এক্টিভিটিতে ইনভলভড হতে। আর অতি অবশ্যই প্রচুর কথা বলি আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই, মনের চাপ অনেকটাই কমে যায়।
এত কথা বলার একটাই কারণ, তোমাদের বয়স কম, এখনই সময় জীবনটাকে বোঝার,  জানাতে চাই মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার কোন বিকল্প নেই। আর আমাদের জীবন শুধু নিজেদের নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে অনেক অনেক আপন জনের মায়া, ভালোবাসা আর স্বপ্ন। আমাদের জন্য বেঁচে থাকাই তাই যথেষ্ট নয়, আমাদের ভালো থাকতে হবে নিজের জন্য, আর সেইসব প্রিয় মুখের জন্য।স্বপ্ন, সফলতা, ব্যর্থতা সব মিলিয়েই জীবন। আর বেঁচে থাকলে সব হবে একদিন, আজ নয়ত কাল। কিন্তু মৃত্যু মানেই তো শেষ, সম্ভাবনাটাকেও মেরে ফেলা।
#সৈয়দা_আঞ্জুমান_আরা_শারমিন

About the author

Add Comment

By Robin